বড়ির সাতকাহন

বড়ি কি?

বড়ি বাঙালির সম্পূর্ণ নিজস্ব একটি খাদ্যদ্রব্য। বড়ি অত্যন্ত ঘরোয়া একটি খাদ্য উপকরণ। অন্যদিকে বড়ি প্রস্তুতকরণ একটি লোকশিল্পও বটে, যার উৎপত্তিস্থল ও সময়কাল সঠিকভাবে জানা দুরূহ। সংস্কৃত বটিকা শব্দ (যার অর্থ বিশেষ পদার্থ হতে প্রস্তুত ক্ষুদ্রাকার গোলাকৃতির কোন বস্তু) থেকে বড়া ও পরে পরিবর্তিত হয়ে বড়ি উদ্ভূত হয়েছে। বাংলার সমস্তপ্রান্তে এটি একটি সমানভাবে সমাদৃত। শুধু যে শাক, ডাঁটা, পোস্ত, শুক্তো ইত্যাদি নিরামিষ পদ রান্নাতেই বড়ি লোকপ্রিয় এমন নয়; মাছ, চিংড়ি ইত্যাদির বহু পদ বড়ি সহযোগে অত্যন্ত স্বাদু।

প্রধানতঃ শীতের মরসুমে বড়ি দেওয়ার অধিক প্রচলন। মাষকলাইয়ের ডাল বড়ি তৈরিতে সর্বাধিক ব্যবহৃত হয়। এছাড়াও মসুর, খেসারি, বিউলীডালের বড়িও বহুল প্রচলিত।

 

বড়ির কতরকমের হয়? 

বড়ি বিভিন্ন রকমের হয় এবং অঞ্চলভেদে এর বিভিন্নতা চোখে পড়ে।

১) সাধারণ বড়ি (মাষকলাই বা মসুর)
সাধারণত খোসা ছাড়ানো মাস কলাই বা মসুর ডাল একরাত ভিজিয়ে রেখে সকালে বেটে বড়ি দেওয়া হয়। সমস্ত বড়ির ক্ষেত্রেই মিশ্রণটি ভাল করে ফেটাতে হয়, যাতে ভিতরে ফাঁপ ভাল হয়। তার পর মিশ্রণটি কোন চালা বা প্রশস্ত পাটাতন, জাল ইত্যদির উপর সম্পূর্ণ হাতের কায়দায় ছোট ছোট শঙ্কু আকৃতির রূপ ধারণ করে। দিন দুই তিন টানা রোদে শুকিয়ে সে বড়ি শুকনো মুখবন্ধ পাত্রে সংগ্রহ করা হয়। এভাবে পরবর্তী কয়েকমাস এমনকি এক বছর পর্যন্ত বড়ি সংরক্ষণ করে রাখা যায়।

২) ফুলবড়ি
রাঢ়ের বিভিন্ন প্রান্তে ফুলবড়ি নামে খুব ছোট ছোট একধরণের বড়ি হয় যা মসুর বা খেসারীর ডাল থেকে তৈরি। ফুলবড়ি ভেজে শাকে দিয়ে বা ‘টক’ বা অম্ল রান্না করে খাওয়া বহুল প্রচলিত। টক কুল, ছোট ছোট করে কাটা বিভিন্ন মরসুমি সব্জি ও বড়ি সহযোগে রাঁধা অম্ল মেদিনীপুরের প্রায় সমস্ত গেরস্থালীতে ভীষণ প্রিয়।

৩) মশলা বড়ি
অন্যান্য বড়িতে আলাদা করে কোন মশলা ব্যবহৃত না হলেও, মশলা বড়ি বিভিন্ন রকমের মশলা সহযোগে তৈরি হয়। আগের রাত্রে ভিজিয়ে রাখা খোসা ছাড়ানো বিউলী ডাল সকালে উঠে বাটা হয়। তারপর তারসাথে পরিমাণমত আদাবাটা ও লবণ মেশানো হয়। শুকনো লঙ্কা, জীরে, পাঁচফোড়ন আধভাঙা করে এর সাথে মেশানো হয়। কেউ কেউ থেঁতো করা চালকুমড়োও মেশান। পূর্ব বাঙলায় এই কুমড়ো বড়ি সবিশেষ জনপ্রিয়। মিশ্রণটিতে কয়েকফোঁটা হিং মেশালে বড়ির স্বাদ আরও খোলতাই হয়। এই বড়ি ঝোল, ঝাল, শুক্তোতে খাওয়া যায়।

৪) গহনা বড়ি বা নকশা বড়ি

গহনা বা নকশা বড়ি বড়ির মধ্যে বিশেষভাবে জনপ্রিয়। এর প্রস্তুত পদ্ধতি বর্ণনা করা হল। খোসা ছাড়ানো বিউলী ডাল সকালে ভিজিয়ে রেখে বিকেলে ভাল করে ধুয়ে নিতে হয়। লক্ষ্য রাখতে হবে ধোয়ার পর ডালে যেন কোনরকমের নোংরা বা অপদ্রব্য না থাকে। পরদিন সকালে শিলনোড়া বা মিক্সীতে এই ভেজানো ডাল এমনভাবে মিহি করে বাঁটতে হবে যেন সান্দ্রভাব বজায় থাকে কিন্তু জল বেশি হয়ে খুব পাতলা না হয়ে যায়।

পরিমাণমত লবণ মিশিয়ে মিশ্রণটিকে একটি গভীর পাত্রে নিয়ে দীর্ঘক্ষণ ফেটানো প্রয়োজন। ফেটানো হয়ে গেলে মিশ্রণটি ফোমের মত দেখায়। তারপর একটি মোটা কাপড়ের টুকরো নিয়ে (আনুমানিক ১০”/১১”) তার মাঝখানে একটি ছোট্ট ফুটো করে চোঙা বা নজেল লাগিয়ে দিতে হয়। এই কাপড়ের মধ্যে ডালের মিশ্রণটি অল্প অল্প নিয়ে অনেকটা জিলিপি বানানোর পদ্ধতিতে) পোস্ত বিছানো থালায় সম্পূর্ণ হাতের কেরামতিতে নকশা বড়ি দেওয়া হয়। নাম থেকেই অনুমেয়, এই বড়ির সাথে বিভিন্ন কল্কা নকশা বা ডিজাইন ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে। অনেকটা আলপনা দেওয়ার মত, পোস্ত বিছানো থালায় নকশা বানিয়ে তারপর সকালের হাল্কা রোদে শোকাতে দেওয়া হয়।

কেউ কেউ পোস্তর বদলে তিলও ব্যবহার করেন, তবে তা বেশীদিন সংরক্ষণ করা যায় না, গন্ধ হয়ে যায়। বেশি কড়া রোদে শোকাতে দিলে বড়ি ভেঙ্গে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। হাল্কা রোদে বড়ির ওপরটা শুকিয়ে গেলে খুন্তি দিয়ে উল্টে দিতে হয় যাতে নিচের অংশটাও ভাল করে শুকিয়ে যায়। সম্পূর্ণ শুকিয়ে গেলে এই বড়ি বিস্কুটের থেকেও হাল্কা ও ভঙ্গুর হয়, তাই অতি সাবধানে কাগজের স্তর দিয়ে টিন না যেকোন মুখবন্ধ পাত্রে সংরক্ষণ করা হয়। ছাঁকা তেলে ভেজে গোটা-গোটা পড়লে পাতে, আহা স্বর্গ সুখ তাতে। ভাতের সঙ্গে এই বড়ি অত্যন্ত উপাদেয়। এছাড়া মেদিনীপুরে চায়ের সাথে ‘টা’ হিসেবে এই বড়ি সবিশেষ জনপ্রিয়।

বড়ির ইতিহাসে  পূর্ব মেদিনীপুর জেলার ভূমিকা কি? 

 

নকশা বড়ি পূর্ব মেদিনীপুরের সংস্কৃতির সাথে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে আছে তা হলফ করে বলা যায়। কারণ এইস্থান ভিন্ন বাঙলার অন্য কোথাও নকশা বড়ি বা গহনা বড়ির বিশেষ চল নেই। এই জেলার প্রত্যেকটি গৃহস্থ, পূর্বসূরি থেকে উত্তরসূরি, এই শিল্পকর্মটিকে ভালবাসেন বললে অত্যুক্তি হয় না। এই ভালবাসা বা ভাললাগা কবে যে নিত্যকর্মে পর্যবসিত হয়েছে কেউ খেয়াল রাখে নি। বাড়ির মহিলারা পরম মমতায় এই শিল্পকর্মটিকে আত্মস্থ করেছেন, পরবর্তী প্রজন্মে এগিয়ে নিয়ে চলেছেন। বাঙালির নিজস্ব এই শিল্পকর্মটি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে সমানভাবে জনপ্রিয়।

সাহিত্যে বড়ির উল্লেখ:

আদি থেকে আধুনিক, বিভিন্ন পর্বের বাংলা সাহিত্যেই বড়ির উল্লেখ পাওয়া যায়। এছাড়াও স্থানীয় লোকাচার, গাথা, ছড়াই বড়ির উল্লেখ চোখে পড়ে। যেমন – “খুকুমণি কেন ভারি/পাতে নেই যে গয়না বড়ি”। বাঙলার বৈষ্ণবদের কাছে বড়ি সহজলভ্য ও বিকল্প প্রোটিন সমৃদ্ধ খাদ্য হবার দরুন বহুকাল থেকেই সমাদৃত। শোনা যায়, শ্রী চৈতন্য মহাপ্রভু বড়ির গুণে বিশেষ মুগ্ধ ছিলেন।

বড়ির অর্থনৈতিক গুরুত্ব:

বড়ি বর্তমানে গ্রামীণবাংলার অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। এর বর্তমান বাজার ঠিক কত টাকার বা বড়ি উৎপাদনে ঠিক কত ‘হাউসহোল্ড’ নিযুক্ত তা নিয়ে কোন রিসার্চ বা মার্কেট সার্ভে হয়েছে বলে জানা নেই। তবে বড়ি উৎপাদন করে অনেক গ্রামীণ মহিলা আজ স্বাবলম্বী ও স্বচ্ছল হয়েছেন।

Please follow and like us:

Related posts