জন্মদিনে সতীশ চন্দ্র সামন্তের স্মৃতি বিজড়িত স্কুল সংস্কারের দাবি

তুহিন শুভ্র আগুয়ান, পূর্ব মেদিনীপুরঃ স্বাধীনতা আন্দোলন মানে ইতিহাসের প্রথম পাতায় উঠে আসে তৎকালীন অবিভক্ত মেদিনীপুর জেলার সংগ্রামীদের কথা।যার মধ্যে অন্যতম এক সংগ্রামী হলেন তাম্রলিপ্ত জাতীয় সরকারের কর্ণধার সর্বাধিনায়ক সতীশচন্দ্র সামন্ত।আজ তাঁর ১১৯তম জন্মজয়ন্তী।তাঁর জন্মজয়ন্তীকে প্রতিবছর তাঁর জন্মভিটে মহিষাদলের গোপালপুরে ঘটা করে পালন করা হয়।তবে জন্মদিন ঘটা করে পালন করা হলেও তাঁর স্মৃতিকে আজ ভুলতে বসেছে তাঁরই জন্মস্থানের মানুষজনেরা।১৯১০ সালে হিজলি টাইডাল ক্যানেলের পাড়ে গড়ে ওঠা মহিষাদল রাজ ইংলিশ স্কুলে পড়াশোনা শুরু করেছিলেন সর্বাধিনায়ক সতীশচন্দ্র সামন্ত।

তবে বর্তমান ঝাঁ-চকচকে যুগের দৌলতে এই মহিষাদল রাজ ইংলিশ স্কুল আজ জরাজীর্ণ দশায় ঠায় দাঁড়িয়ে রয়েছে।এ ব্যাপারে সংস্কারের কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিদের।ভোটের সময় রাজনৈতিক কর্তাব্যক্তিরা মহিষাদলবাসিকে এই স্কুল সংস্কারের আশ্বাস দিলেও ভোট মিটলে তা কোথায় যেনো বাতাসের সঙ্গে মিলিয়ে যায়।তাই তাঁর ১১৯তম জন্মজয়ন্তীতে এই স্কুল সংস্কারের দাবি জানাচ্ছেন মহিষাদলবাসি ও এই স্কুলের প্রাক্তণ ছাত্র উভয়েই।

মহিষাদল রাজ ইংলিশ স্কুলের প্রাক্তন ছাত্র তথা মহিষাদলের বাসিন্দা প্রদীপ কুমার মাজী জানান,“১৯৭৯ সাল থেকে আমার এই স্কুলে পড়াশোনার সৌভাগ্য হয়েছিল।এই স্কুলে সর্বাধিনায়ক সতীশচন্দ্র সামন্ত সহ বহু বিশিষ্টজনেরা পড়াশোনা করেছিলেন।তবে বর্তমানে এই স্কুল যেভাবে জরাজীর্ণ দশায় পড়ে রয়েছে তাতে আমি পশ্চিমবঙ্গ সরকারের কাছে আবেদন জানাবো দ্রুত এই স্কুলের সংস্কার হোক এবং হেরিটেজ ঘোষণা করে এই স্কুলকে পর্যটকদের উদ্দেশে খুলে দেওয়া হোক”।

মহিষাদলের শিক্ষার ইতিহাস ঘাটলে এই স্কুল সম্পর্কে জানা যায়,অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রথমদিকে মহিষাদলের শিক্ষা ব‍্যবস্হা ছিল সংকীর্ণ।সেই সময় মহিষাদলের রাজা লছমন প্রসাদ গর্গ তাঁর অনুরূপে শিক্ষিত করার জন্য বাড়িতে একজন ইংরেজ গভর্নেন্স নিয়োগ করেন।এই গভর্নেন্স ও তার পরিবারকে রাখার জন্য হিজলি ক‍্যানেলের পূর্বপাড়ে ফরাসি স্হাপত‍্যশৈলী একটি বাড়ি নির্মাণ করে।ওই বাড়িতেই রাজা লছমন প্রসাদ গর্গ ১৮৭৪ খ্রিঃ রাজ ইংলিশ স্কুল প্রতিষ্ঠা করে জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করেন।যাকে মহিষাদলবাসির ভাষায় লাল বিল্ডিং বলা হয়।এই স্কুলটি অবিভক্ত মেদিনীপুর জেলার সর্বপ্রথম উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয়।কালক্রমে এই স্কুলে জরাজীর্ণ দশা গ্রাস করার মহিষাদল রাজ ইংলিশ স্কুল পরে এক নতুন ঝা চকচকে বিল্ডিংয়ে রাজ হাইস্কুল নামে পরিচিত হয়।যা আজও মহিষাদলের শিক্ষার মানকে বহন করে চলেছে।

এনিয়ে স্মৃতিচারণায় মহিষাদল রাজ হাই স্কুলের প্রাক্তন শিক্ষক অশোক কুমার লাটুয়া জানান,“এই স্কুলে এককালে তমলুকের বিশিষ্ট স্বাধীনতা সংগ্রামী সতীশ চন্দ্র সামন্ত সহ কবি নিরালা পড়াশোনা করেছিলেন।সে কারণে আমার দিক থেকে মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রীর কাছে একটাই কথা জানতে চাই যদি এই এই স্কুলকে সংস্কার করা হয় তাহলে এই লাল বিল্ডিংটি কালের দরবারে স্থিতিশীল অবস্থায় ইতিহাসের পাতায় আরো দীর্ঘদিন ঠাঁই পাবে।”।

মহিষাদল রাজ ইংলিশ স্কুল আজ ঝাঁ চকচকে মহিষাদল রাজ্ হাই স্কুলে পরিণত হলেও রাজ ইংলিশ স্কুলের প্রতিটি ইট-কাঠের ফাঁকে ফাঁকে লুকিয়ে রয়েছে হাজারো পুরনো স্মৃতি।এই স্কুলে এককালে পড়েছিলেন কবি নিরালার মতো বহু গুণমুগ্ধ ব্যাক্তিরা।তা সত্ত্বেও কিভাবে এই স্কুল সংস্কারের আড়ালে পড়ে রয়েছে সেটাই একমাত্র প্রশ্ন মহিষাদল রাজ হাইস্কুলের প্রাক্তন ছাত্র দেবাশীষ দাসের।তিনি জানান,“ইতিমধ্যে যদি এই স্কুলের সংস্কার না করা হয় তাহলে আগামীদিনে হয়তো সতীশচন্দ্র সামন্ত ও কবি নিরালার মতো বিশিষ্টজনেদের স্মৃতি আর আগলে রাখা সম্ভব হবে না।

তাই কেমন করে আজও এই স্কুল সংস্কারের আড়ালে সেটাই এখন আমার একমাত্র প্রশ্ন।”এই প্রশ্নের উত্তরে মহিষাদল পঞ্চায়েত সমিতির সহ-সভাপতি তিলক কুমার চক্রবর্তী জানান,“আমরা পঞ্চায়েত সমিতির দখলে আসার পর একাধিক উন্নয়নমূলক কাজকর্ম করেছি।তবে এই রাজ ইংলিশ স্কুলের ভগ্নপ্রায় দশা আমাদের নজরে রয়েছে।আমাদের সিদ্ধান্তের মধ্যে রয়েছে এই স্কুল দ্রুত সংস্কার করা হবে।”

মহিষাদল রাজ ইংলিশ স্কুলের পার্শ্ববর্তী মহিষাদল রাজবাড়িকে কেন্দ্র করে এখন এক পর্যটন ক্ষেত্র গড়ে উঠেছে মহিষাদলে।তাই রোজ বহু দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ ছুটে আসেন এই মহিষাদলে।ফলে বলা যায় এই ঐতিহাসিক মহিষাদল রাজ ইংলিশ স্কুলকে যদি সংস্কার করে পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হয় তাহলে এখানেও রোজ ভিড় জমাবেন বহু মানুষজন।আর বিশ্বের দরবারে ছড়িয়ে পড়বে মহিষাদলের নাম।

Please follow and like us:

Related posts